কাজী মোহাম্মদ আশিক-উজ-জামান: কানাডিয়ান ক্রিকেটে বাংলাদেশি উইকেটকিপারের রাজত্ব
ঢাকার স্কুল মাঠ থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রা
কাজী মোহাম্মদ আশিক-উজ-জামানের ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসার বীজ রোপিত হয়েছিল ঢাকার বুকেই। তিনি ঢাকার অত্যন্ত সুপরিচিত এবং ঐতিহ্যবাহী দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—সেন্ট যোসেফ হাই স্কুল এবং নটর ডেম কলেজ-এর ছাত্র ছিলেন। এই দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই তাদের চমৎকার ক্রীড়া সংস্কৃতির জন্য পরিচিত। এখানেই আশিক নিজের উইকেটকিপিং গ্লাভস এবং ব্যাটিংয়ের কলাকৌশলকে প্রথম ধারালো করতে শুরু করেন। বন্ধুদের সাথে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ক্রিকেট খেলা, ক্লাসের ফাঁকে কিংবা ছুটির দিনে মাঠ দাপিয়ে বেড়ানো—এই সবকিছুই ছিল তার শৈশব ও কৈশোরের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কিন্তু জীবন তো আর এক জায়গায় স্থবির থাকে না। অনেক প্রবাসী বাঙালির মতো আশিককেও একসময় জীবনের বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ক্যারিয়ার গড়া, স্থাপত্যশিল্পের (architecture) জটিল কাজ, কাজের ডেডলাইন এবং পারিবারিক দায়িত্ব সামলানোর ব্যস্ততায় তিনি জড়িয়ে পড়েন। পড়াশোনা ও পেশাগত কারণে একসময় তাকে পাড়ি জমাতে হয় কানাডায়। তবে প্রবাস জীবনের হাজারো ব্যস্ততা আর নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়ার লড়াইয়ের মাঝেও একটি জিনিস তার মন থেকে কখনও মুছে যায়নি—আর তা হলো ক্রিকেট। কারণ, বাঙালির হৃদয়ে ক্রিকেট শুধু একটি খেলা নয়, এটি একটি গভীর অনুভূতি।
কানাডায় নতুন অধ্যায়: লাস্ট ম্যান স্ট্যান্ডস ক্রিকেটে রাজত্ব
কানাডায় থিতু হওয়ার পর আশিক আবারও তার চেনা গ্লাভস জোড়া হাতে তুলে নেন। ৪১ বছর বয়সে এসে যেখানে অনেকেই খেলাধুলা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবেন, সেখানে আশিক নতুন করে শুরু করেন। আর এই নতুন শুরুটাই তাকে এনে দেয় সাফল্য। ২০২২ সাল থেকে তিনি কানাডার লাস্ট ম্যান স্ট্যান্ডস (LMS) ক্রিকেটে এক নম্বর র্যাঙ্কিংধারী উইকেটকিপার হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন।
লাস্ট ম্যান স্ট্যান্ডস বা এলএমএস হলো বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি অপেশাদার ক্রিকেট ফরম্যাট, যেখানে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। এই বিশ্বমঞ্চে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে আশিক আজ কানাডার শীর্ষ উইকেটকিপার তো বটেই, বিশ্বজুড়ে এলএমএস উইকেটকিপারদের তালিকায় শীর্ষ ৫০০ জনের মধ্যে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। উইকেটের পেছনে তার বিশ্বস্ত হাত, চটপটে নড়াচড়া এবং আম্পায়ারকে প্রভাবিত করার মতো নাটকীয় আবেদন তাকে এই টুর্নামেন্টের অন্যতম আকর্ষণীয় ব্যক্তিতে পরিণত করেছে।
পরিসংখ্যানের আয়নায় আশিক-উজ-জামানের পারফরম্যান্স
আশিকের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে তার কঠোর পরিশ্রম এবং ধারাবাহিকতা। তার পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বোঝা যায় তিনি কতটা প্রতিভাবান একজন cricketer। নিচে তার এলএমএস ক্যারিয়ারের কিছু উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান দেওয়া হলো:
- মোট ম্যাচ: ৫৮টি এলএমএস ম্যাচ
- মোট রান: ১,৩৩০ রান
- ব্যাটিং গড়: ২৮.৯১
- অর্ধশতক (হাফ সেঞ্চুরি): ৭টি
- সর্বোচ্চ স্কোর: ৫৩ রান
- স্ট্রাইক রেট: ১১৩.৮৭
পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবেই প্রমাণ করে যে, আশিক শুধু উইকেটের পেছনেই সেরা নন, দলের প্রয়োজনে ব্যাট হাতেও সমান অবদান রাখতে পারেন। ১১৩.৮৭ স্ট্রাইক রেট এবং প্রায় ২৯ গড়ে রান করা যেকোনো অপেশাদার ক্রিকেটারের জন্যই অত্যন্ত গর্বের বিষয়। উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে অনবরত সতীর্থদের উৎসাহ দেওয়া এবং প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার ক্ষেত্রে তার কোনো জুড়ি নেই। সতীর্থরা প্রায়ই রসিকতা করে বলেন যে, আশিক প্রতিটি অপেশাদার ম্যাচকেই এমনভাবে খেলেন যেন এটি কোনো বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল! তবে ম্যাচ শেষে ক্লান্তি ভুলে সবাই মিলে খাঁটি বাংলাদেশি চা পানের আড্ডাটি দিতে ভুলেন না তারা। এই আড্ডাই যেন তাদের দীর্ঘদিনের ক্লান্তি দূর করে দেয়।
মাঠের বাইরে পরিবার এবং আগামী প্রজন্মের অনুপ্রেরণা
একজন মানুষের পক্ষে এত ব্যস্ততার মাঝেও খেলাধুলা চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হতো, যদি না পেছনে একটি শক্ত সমর্থক গোষ্ঠী থাকত। আশিকের ক্ষেত্রে সেই অবিচ্ছেদ্য অংশটি হলো তার পরিবার। সপ্তাহের দীর্ঘ কর্মদিবস এবং কাজের ব্যস্ততা শেষে উইকএন্ডে যখন তিনি মাঠে যান, তখন গ্যালারি থেকে তাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেন তার স্ত্রী অনিতা। অনিতা কেবল তার খেলাই দেখেন না, বরং আশিকের এই ক্রিকেট প্রেমের অন্যতম বড় সমর্থক ও অনুপ্রেরণাদাতা।
এদিকে আশিকের পরিবারে এখন ক্রিকেটের নতুন প্রদীপ জ্বলতে শুরু করেছে। তার মাত্র আড়াই বছরের ছেলে আরীজ এখনই বাড়িতে ছোট ছোট প্লাস্টিকের ব্যাট দিয়ে বল পেটানো শুরু করে দিয়েছে। এই দৃশ্যটি দেখে সহজেই অনুমান করা যায় যে, ক্রিকেটের প্রতি এই গভীর ভালোবাসা এবং উইকেটকিপিংয়ের সেই চিরচেনা নাটকীয়তা হয়তো এই পরিবারের রক্তেই মিশে আছে। আরীজের এই ছোট্ট হাতের শটগুলো যেন আশিকের ক্রিকেটীয় উত্তরাধিকারকেই বহন করে চলেছে।
বয়স কেবলই একটি সংখ্যা: অপ্রতিরোধ্য ক্রিকেট প্যাশন
আজকের দিনে যখন ক্রীড়াজগৎ তরুণদের দখলে এবং বয়সের কারণে অনেক অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ও মাঠ থেকে বিদায় নেন, তখন কাজী মোহাম্মদ আশিক-উজ-জামানের গল্পটি এক বিশাল অনুপ্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, মনের ভেতর যদি সত্যিকারের ভালোবাসা এবং কাজের প্রতি একনিষ্ঠতা থাকে, তবে বয়স কোনো বাধা হতে পারে না। ৪১ বছর বয়সে এসেও যেভাবে তিনি উইকেটের পেছনে ডাইভ দিচ্ছেন এবং দলের জন্য রান তুলছেন, তা যেকোনো বয়সীদের জন্যই শিক্ষণীয়।
আশিকের এই যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের স্বপ্ন বা ভালো লাগা কখনও অবসর নেয় না। এটি কেবল মহাদেশ থেকে মহাদেশে স্থানান্তরিত হয়, নতুন করে ডানা মেলে এবং আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে। ঢাকার সেই চঞ্চল ছেলেটি আজ কানাডার মাটিতে দাঁড়িয়ে লাল-সবুজের অহংকার বয়ে নিয়ে চলেছেন, যা প্রতিটি প্রবাসীর জন্য এক পরম গর্বের বিষয়।