Ishan Kishan’s Financial Help To Teammate Leaked – ঈশান কিষাণের মানবিকতা: সতীর্থ সাকিব হুসেনকে যেভাবে সাহায্য করলেন তারকা ক্রিকেটার
ক্রিকেটের সীমানা পেরিয়ে এক মানবিক গল্প
ক্রিকেট কেবল চার-ছক্কার খেলা নয়, এটি আবেগ, লড়াই আর পারস্পরিক বন্ধুত্বেরও এক অনন্য মঞ্চ। আইপিএল ২০২৬ (IPL 2026) মরশুমে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের (SRH) অন্দরমহল থেকে উঠে এসেছে এমনই এক হৃদয়স্পর্শী গল্প। তরুণ ডানহাতি পেসার সাকিব হুসেনের কঠিন দিনগুলোতে বড় ভাইয়ের মতো পাশে দাঁড়িয়েছেন দলের তারকা ক্রিকেটার ঈশান কিষাণ (Ishan Kishan)। সম্প্রতি সাকিবের একটি সাক্ষাৎকার সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে, যেখানে তিনি ঈশানের এই মহানুভবতার কথা প্রকাশ করেছেন যা লাখো ভক্তের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।
সাকিব হুসেনের জুতোহীন কঠিন লড়াই
সাকিব হুসেনের জন্য ক্রিকেটের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। ইএসপিএন ক্রিকইনফোকে (ESPNCricinfo) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাকিব তাঁর শুরুর দিকের চরম আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, একসময় তাঁর কাছে ভালো মানের ক্রিকেট খেলার জুতো কেনার মতো টাকা ছিল না। ১২,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা দামের প্রফেশনাল স্পাইক জুতো পরা তাঁর কাছে ছিল এক অলীক স্বপ্ন।
সাকিব বলেন, \”এমন একটা সময় ছিল যখন আমার কাছে কোনো জুতো ছিল না। এত দামি একজোড়া জুতো কেনার কথা আমি ভাবতেও পারতাম না। ১২,০০০-১৫,০০০ টাকা দামের জুতো আমি কীভাবে পরবো? ফুটপাথ থেকে মাত্র ২০০-৩০০ টাকায় কেনা জুতো খুব দ্রুত ছিঁড়ে যেত। সোলের অংশটা আলগা হয়ে যেত। স্পাইক না থাকায় বল করার সময় আমার পা পিছলে যেত এবং বারবার আমার গোড়ালি মচকে যেত।\” তবুও খেলার প্রতি অদম্য ভালোবাসা তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি।
পাশে দাঁড়ালেন বড় ভাই ঈশান কিষাণ
সাকিবের এই কঠিন সংগ্রামের কথা যখন ঈশান কিষাণ জানতে পারেন, তিনি এক মুহূর্তও দেরি করেননি। সতীর্থের সাহায্যে অবিলম্বে এগিয়ে আসেন তিনি। ঈশান সাকিবের জন্য প্রায় ১২,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা মূল্যের ৬-৭ জোড়া দামি প্রফেশনাল স্পাইক জুতো উপহার দেন, যা সাকিব পুরো মরশুম জুড়ে ব্যবহার করেছেন।
সাকিব আবেগাপ্লুত হয়ে যোগ করেন, \”বর্তমানে আমার কাছে ৬ জোড়া স্পাইক জুতো রয়েছে, যা ঈশান ভাইয়া আমাকে কিনে দিয়েছেন। ঈশান ভাইয়া আমাকে বলেছিলেন যে তিনি আমার জন্য স্পাইক জুতো এনে দেবেন এবং আমি তাঁকে অ্যাডিডাসের ‘অ্যাডিপাওয়ার’ (Adipower) জুতোর কথা জানিয়েছিলাম। পুরো মরশুমে আমি তাঁর দেওয়া জুতো পরেই খেলেছি।\”
একই মাটির টান ও সহমর্মিতা
ঈশান কিষাণ সাকিবের এই কষ্ট খুব সহজেই বুঝতে পেরেছিলেন, কারণ তাঁর নিজের অতীতও ছিল অত্যন্ত সাধারণ। ঈশান এবং সাকিব উভয়েরই আদি বাড়ি বিহারে। ঈশানের পরিবারকেও একসময় তাঁর cricketer হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে চরম আর্থিক অনটনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। কঠোর পরিশ্রম ও জেদের জোরে আজ ঈশান ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম বড় তারকা হয়ে উঠেছেন। তাই সাকিবের কষ্টের দিনগুলো দেখে তিনি নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
আইপিএল ২০২৬-এ সাকিবের দুর্দান্ত অভিষেক
ঈশানের দেওয়া সেই জুতো পায়ে দিয়েই সাকিব হুসেন আইপিএল ২০২৬-এ সানরাইজার্স হায়দরাবাদের হয়ে বল হাতে আগুন ঝরিয়েছেন। নিজের অভিষেক মরশুমেই তিনি ১১টি ম্যাচে ১৫টি উইকেট শিকার করেন। তাঁর এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে তিনি এই মরশুমের অন্যতম সেরা উদীয়মান খেলোয়াড় (Emerging Player) হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
ঈশান কিষাণের ব্যাট হাতে সফল মরশুম
শুধুমাত্র মাঠের বাইরে মানবিকতা দেখিয়েই নয়, মাঠের ভেতরেও আইপিএল ২০২৬ মরশুমটি ঈশান কিষাণের জন্য অত্যন্ত সফল ছিল। প্যাট কামিন্সের অনুপস্থিতিতে টুর্নামেন্টের শুরুতে হায়দরাবাদ দলকে চমৎকারভাবে নেতৃত্বও দিয়েছিলেন তিনি। ব্যাট হাতে ১৫টি ম্যাচে ৪০.১৩ গড়ে ৬০২ রান সংগ্রহ করেন ঈশান, যার মধ্যে ছিল ৬টি অর্ধশতক এবং ৩২টি বিশাল ছক্কা। আইপিএলের ইতিহাসে এই প্রথমবার তিনি এক মরশুমে ৬০০ রানের গণ্ডি অতিক্রম করলেন। তাঁর এই দুর্দান্ত ফর্ম হায়দরাবাদকে প্লে-অফে পৌঁছাতে সাহায্য করেছিল।
এলিমিনেটরে বিদায় ও হায়দরাবাদের স্বপ্নভঙ্গ
এত ভালো একটি মরশুম কাটানোর পরও সানরাইজার্স হায়দরাবাদের শিরোপা জয়ের স্বপ্ন ভেঙে যায় চণ্ডীগড়ে অনুষ্ঠিত এলিমিনেটর ম্যাচে। রাজস্থান রয়্যালসের (RR) বিরুদ্ধে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয় তাদের। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে রাজস্থান রয়্যালসের তরুণ ব্যাটার বৈভব সূর্যবংশী মাত্র ২৯ বলে ৯৭ রানের এক টর্নেডো ইনিংস খেলেন। তাঁর সাথে ধ্রুব জুরেলের অর্ধশতকের ওপর ভর করে রাজস্থান রয়্যালস ২৪৩ রানের এক বিশাল স্কোর খাড়া করে।
পাহাড়সম রান তাড়া করতে নেমে শুরুতেই চাপে পড়ে যায় সানরাইজার্স হায়দরাবাদ। অভিষেক শর্মা শূন্য রানে বিদায় নেন। ট্রাভিস হেড ও ঈশান কিষাণ ভালো শুরু করলেও তা বড় ইনিংসে রূপান্তর করতে পারেননি। ঈশান মাত্র ১১ বলে ৩৩ রান করে জোফ্রা আর্চারের বলে আউট হন। হেনরিখ ক্লাসেন এবং নীতিশ রেড্ডি লড়াই করার চেষ্টা করলেও তা যথেষ্ট ছিল না। শেষ পর্যন্ত হায়দরাবাদ ১৯৬ রানে অলআউট হয়ে যায় এবং ৪৭ রানে ম্যাচটি হেরে যায়। জোফ্রা আর্চার ৩টি উইকেট নিয়ে হায়দরাবাদের ব্যাটিং লাইনে ধস নামান। এই জয়ের ফলে রাজস্থান রয়্যালস কোয়ালিফায়ার ২-এ প্রবেশ করে, যেখানে তারা গুজরাট টাইটান্সের মুখোমুখি হবে।
হার-জিত খেলারই অংশ, কিন্তু ঈশান কিষাণের মতো তারকা ক্রিকেটারদের এমন মানবিক আচরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মাঠের লড়াইয়ের বাইরেও এক সুন্দর ভ্রাতৃত্বের পৃথিবী রয়েছে। সাকিবের মতো তরুণ প্রতিভাদের পাশে দাঁড়িয়ে ঈশান যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে দীর্ঘদিন অম্লান থাকবে।