শহীদ আফ্রিদি ও সন্ত্রাসী উজাইর বালুচের নৈশভোজের ছবি ফাঁস, উত্তাল সোশ্যাল মিডিয়া
শহীদ আফ্রিদি ও কুখ্যাত সন্ত্রাসী উজাইর বালুচের নৈশভোজের ছবি ফাঁস: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র বিতর্ক
পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেট তারকা এবং অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদি মাঠের ভেতরের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি মাঠের বাইরের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে বরাবরই আলোচনা ও বিতর্কের কেন্দ্রে থেকেছেন। এবার তার অতীত জীবনের একটি গোপন অধ্যায় সামনে আসায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের মোস্ট ওয়ান্টেড বা কুখ্যাত সন্ত্রাসী উজাইর বালুচের সাথে শহীদ আফ্রিদির নৈশভোজের একটি পুরনো ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে। এই ছবি ফাঁস হওয়ার পর ক্রিকেটপ্রেমী এবং বিশেষ করে ভারতীয় সমর্থকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই আফ্রিদির চরিত্র, নৈতিকতা এবং প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।
২০১৩ সালের ছবি নতুন করে ভাইরাল
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিটি মূলত ২০১৩ সালের। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, শহীদ আফ্রিদি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ পরিবেশে কুখ্যাত গ্যাংস্টার ও সন্ত্রাসী উজাইর বালুচের সাথে বসে রাতের খাবার উপভোগ করছেন। এই ছবিটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই ইন্টারনেটে আফ্রিদিকে নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। অনেকে এই ছবিটিকে আফ্রিদির চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং অপরাধী চক্রের সাথে তার ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।
কে এই উজাইর বালুচ?
যাদের মনে প্রশ্ন জাগছে যে উজাইর বালুচ আসলে কে, তাদের জন্য জানানো প্রয়োজন যে তিনি করাচির কুখ্যাত লিয়ারি গ্যাং নেটওয়ার্কের (Lyari gang network) প্রধান ছিলেন। তার বিরুদ্ধে টার্গেট কিলিং বা সুনির্দিষ্ট হত্যা, চাঁদাবাজি, গ্যাং সহিংসতা, মাদক চোরাচালান এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ২০১৬ সালে পাকিস্তানি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাকে গ্রেপ্তার করার পর তিনি দেশটির অন্যতম শীর্ষ অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হন।
সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া বলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা ‘ধুরন্ধর’-এ উজাইর বালুচ নামের একটি চরিত্রকে চিত্রায়িত করা হয়েছে, যেখানে তাকে ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে মদদদাতা একজন গ্যাংস্টার হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলে, এমন একজন মারাত্মক অপরাধীর সাথে শহীদ আফ্রিদির এই ঘনিষ্ঠ ছবি ভক্তদের মধ্যে চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ভক্তরা অভিযোগ করছেন যে, একজন জাতীয় নায়ক হয়েও আফ্রিদি কীভাবে এমন একজন অপরাধীর সাথে মেলামেশা করতে পারেন।
আফ্রিদির ভারত-বিদ্বেষী অতীত এবং নানা বিতর্ক
শহীদ আফ্রিদির জন্য বিতর্ক নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে ভারতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় আপত্তিকর মন্তব্য করে তিনি বারবার সংবাদ শিরোনামে এসেছেন। ২০১৮ সালে আফ্রিদি কাশ্মীরের পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের তীব্র সমালোচনা করে একটি টুইট করেছিলেন। সেখানে তিনি কাশ্মীরের পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেন এবং ভারতের বিরুদ্ধে কাশ্মীরিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও স্বাধীনতা দমনের অভিযোগ তোলেন।
এখানেই শেষ নয়, বিভিন্ন টেলিভিশন টকশো এবং সাক্ষাৎকারে আফ্রিদি প্রায়শই ভারতীয় মিডিয়া এবং রাজনীতিকে নিশানা করে উসকানিমূলক মন্তব্য করেছেন। ২০২৫ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনার সময় এই ক্রিকেটার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে একটি বিজয় সমাবেশ করেছিলেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ব্যঙ্গ করে একাধিক অবমাননাকর পোস্ট শেয়ার করেছিলেন। এসব বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে ভারতে আফ্রিদি অত্যন্ত বিতর্কিত এবং অপছন্দনীয় একজন ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।
পাকিস্তানে এখনো তিনি জাতীয় বীর: ‘হিলাল-ই-ইমতিয়াজ’ সম্মাননা
ভারতের মাটিতে বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যতই বিতর্ক থাকুক না কেন, পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ ও সরকারের কাছে শহীদ আফ্রিদি এখনো একজন বড় নায়ক। অতি সম্প্রতি পাকিস্তান সরকার তাকে দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বেসামরিক সম্মাননা ‘হিলাল-ই-ইমতিয়াজ’-এ ভূষিত করেছে। এর মাধ্যমে তিনি পাকিস্তানের ইতিহাসে চতুর্থ ক্রিকেটার হিসেবে এই অনন্য সম্মাননা অর্জন করলেন।
২০২৬ সালের ১৩ মে আইওয়ান-ই-সদরে আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলী জারদারি স্বয়ং আফ্রিদির হাতে এই পুরস্কার তুলে দেন। এই সম্মাননা পাওয়ার পর আফ্রিদি এখন ইমরান খান, ওয়াসিম আকরাম এবং ওয়াকার ইউনুসের মতো কিংবদন্তি ক্রিকেটারদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন, যারা পূর্বে এই রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন।
ক্রিকেট ক্যারিয়ারে শহীদ আফ্রিদির অবদান
দীর্ঘ ক্রীড়া জীবনে শহীদ আফ্রিদি পাকিস্তানের হয়ে তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ৫০০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। পাকিস্তানের আক্রমণাত্মক ওয়ানডে ক্রিকেটের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হয়। ১৯৯৬ সালে নাইরোবিতে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে মাত্র ৩৭ বলে করা তার দ্রুততম ওয়ানডে সেঞ্চুরিটি ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ইনিংস হিসেবে আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সেই ইনিংসটিই তাকে বিশ্ব ক্রিকেটে এক রাতের মধ্যে মহাতারকা বানিয়ে দিয়েছিল।
তবে মাঠের সেই গৌরবময় ক্যারিয়ার এখন এই ধরনের গুরুতর বিতর্কের ছায়ায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। সন্ত্রাসী উজাইর বালুচের সাথে তার এই ডিনার ছবি ফাঁসের ঘটনাটি আফ্রিদির ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার দেশপ্রেম ও সততা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।