Vaibhav Sooryavanshi IPL Centuries – বৈভব সূর্যবংশী আইপিএল সেঞ্চুরি: রেকর্ড গড়া ইনিংসের বিস্তারিত তালিকা
বর্তমান ক্রিকেট বিশ্বে যদি কোনো তরুণ ক্রিকেটারকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়ে থাকে, তবে তিনি হলেন বৈভব সূর্যবংশী (Vaibhav Sooryavanshi)। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই তিনি বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় এবং জনপ্রিয় মঞ্চ ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) নিজের এক অনন্য সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। আইপিএল ২০২৬-এর এলিমিনেটর ১ ম্যাচে এই বিস্ময় বালক একের পর এক রেকর্ড ভেঙে ক্রিকেট দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। এমনকি এক মরসুমে সবচেয়ে বেশি ছক্কা মারার ক্ষেত্রে তিনি কিংবদন্তি ক্রিস গেইলের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছেন। রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে ওপেন করা এই বাঁহাতি ব্যাটারের ব্যাটিং যেন একঝলক তাজা বাতাস, যা প্রতিপক্ষের বোলারদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করে।
বিহার থেকে আইপিএল: বৈভব সূর্যবংশীর উত্থান
বৈভবের বিশ্বসেরা ক্রিকেটার হয়ে ওঠার গল্পটি রূপকথার চেয়ে কম কিছু নয়। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি বিহারের হয়ে ঐতিহ্যবাহী রঞ্জি ট্রফিতে অভিষেক করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি তার রাজ্যের হয়ে দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আত্মপ্রকাশের ইতিহাস গড়েন। মাঠে তার নির্ভীক ব্যাটিং এবং আক্রমণাত্মক মানসিকতা দ্রুতই আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফলস্বরূপ, ২০২৫ সালের আইপিএল মেগা নিলামে রাজস্থান রয়্যালস (RR) তাকে নিজেদের দলে ভেড়াতে মরিয়া হয়ে ওঠে। মাত্র ৩০ লক্ষ টাকার বেস প্রাইস নিয়ে নিলামে আসা বৈভবের জন্য শুরু হয় তীব্র দর কষাকষি। অবশেষে রাজস্থান-ভিত্তিক ফ্র্যাঞ্চাইজিটি ১.১০ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কে এই তরুণ তুর্কিকে দলে অন্তর্ভুক্ত করে।
আইপিএলে বৈভব সূর্যবংশীর শতরানের রেকর্ড
আইপিএল ক্যারিয়ারের প্রথম দুটি মরসুমেই (২০২৫ এবং ২০২৬) বৈভব প্রমাণ করেছেন যে তিনি লম্বা রেসের ঘোড়া। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই তিনি দুটি চোখধাঁধানো শতরান এবং বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্ধশতরান নিজের ঝুলিতে পুরেছেন। ক্রিকেট অনুরাগীদের জন্য এটি অত্যন্ত গর্বের বিষয় যে, আইপিএলের ইতিহাসের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দ্রুততম শতরানের রেকর্ড দুটিই এখন বৈভব সূর্যবংশীর নামে নিবন্ধিত রয়েছে। নিচে তার সেই ঐতিহাসিক সেঞ্চুরিগুলোর খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করা হলো।
১. প্রথম আইপিএল সেঞ্চুরি: ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান (২০২৫)
২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল তারিখে আইপিএলের ৪৭তম ম্যাচে রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে বৈভব এক অবিশ্বাস্য ইনিংস খেলেন। তৎকালীন মাত্র ১৪ বছর বয়সী এই ব্যাটার মাত্র ৩৮ বলে ১০১ রানের এক বিধ্বংসী ইনিংস উপহার দেন। এই ইনিংসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি ছিল যে তিনি মাত্র ৩৫ বলে নিজের সেঞ্চুরি পূর্ণ করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি আইপিএল ইতিহাসের দ্বিতীয় দ্রুততম শতরান করার গৌরব অর্জন করেন। এই তালিকায় তার ওপরে রয়েছেন কেবল ক্রিস গেইল, যিনি ২০১৩ সালে পুনে ওয়ারিয়র্সের বিপক্ষে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের হয়ে মাত্র ৩০ বলে সেঞ্চুরি করেছিলেন।
পাশাপাশি, মাত্র ১৪ বছর ৩২ দিন বয়সে সেঞ্চুরি করে বৈভব সূর্যবংশী টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান হিসেবে নিজের নাম লেখান। তিনি ভারতের বিজয় জোলের (১৮ বছর ১১৮ দিন) দীর্ঘদিনের রেকর্ডটি ভেঙে দেন। শুধু টি-টোয়েন্টিই নয়, পেশাদার ক্রিকেটের যেকোনো সীমিত ওভারের ফরম্যাটের (লিস্ট এ ও টি-টোয়েন্টি) history-তেও এটিই সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে শতরানের রেকর্ড। এর আগে ১৯৮৬ সালে পাকিস্তানের ঘরোয়া লিস্ট এ টুর্নামেন্টে জহুর এলাহী ১৫ বছর ২০৯ দিন বয়সে শতরান করেছিলেন, বৈভব সেই বিশ্বরেকর্ডও নিজের করে নেন।
২. সানরাইজার্স হায়দরাবাদের বিপক্ষে দ্বিতীয় শতরান (আইপিএল ২০২৬)
প্রথম মরসুমের সাফল্যের ধারা বজায় রেখে আইপিএল ২০২৬-এও বৈভব তার বিধ্বংসী ব্যাটিং অব্যাহত রাখেন। জয়পুরের ঘরের মাঠে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের (SRH) বিপক্ষে তিনি তার ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় আইপিএল শতরানটি তুলে নেন। এই ম্যাচে বৈভব মাত্র ৩৬ বলে শতরানের মাইলফলক স্পর্শ করেন, যা আইপিএলের ইতিহাসে তৃতীয় দ্রুততম সেঞ্চুরি। তার এই চোখধাঁধানো ইনিংসে ছিল ১২টি বিশাল ছক্কা এবং ৫টি চারের মার। প্রতিপক্ষের বোলারদের কোনো সুযোগ না দিয়ে মাঠের চারদিকে বল আছড়ে ফেলে তিনি এই স্মরণীয় ইনিংসটি সাজিয়েছিলেন।
এলিমিনেটরে অল্পের জন্য সেঞ্চুরি মিস (আইপিএল ২০২৬)
আইপিএল ২০২৬-এর এলিমিনেটর ম্যাচে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের বিপক্ষেই বৈভব সূর্যবংশী প্রায় টানা দ্বিতীয় শতরান করার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। মুল্লানপুরের হাই-প্রেশার ম্যাচে তিনি মাত্র ২৯ বলে ৯৭ রানের এক ঝোড়ো ইনিংস খেলেন। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে শতরানের মাত্র ৩ রান দূরে থাকতে বাউন্ডারি লাইনে ক্যাচ আউট হয়ে যান তিনি। সেঞ্চুরি মিস করলেও তার এই বিধ্বংসী ইনিংসটি দলের জয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল।
পাওয়ারপ্লেতে তাণ্ডব এবং অর্ধশতরানসমূহ
১৫ বছর বয়সী এই রাজস্থান রয়্যালস তারকা ইতিমধ্যেই পাওয়ারপ্লে ওভারগুলোতে বোলারদের ওপর আধিপত্য বিস্তারে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেছেন। প্রথম ওভার থেকেই আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলে প্রতিপক্ষ দলের বোলিং লাইন-আপকে গুঁড়িয়ে দেওয়াই তার মূল বৈশিষ্ট্য। ২০২৫ সালের ১৯ এপ্রিল লখনউ সুপার জায়ান্টসের (LSG) বিপক্ষে আইপিএলে অভিষেক করার পর থেকে বৈভব একের পর এক দুর্দান্ত ইনিংস উপহার দিয়ে চলেছেন। এই কিশোর ব্যাটারের শুরুটা যেভাবে হয়েছে, তাতে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের ধারণা—তিনি ভবিষ্যতে বিশ্ব ক্রিকেটের বহু বড় রেকর্ড নিজের করে নেবেন। বিহারের এই তরুণ তুর্কির জয়যাত্রা কেবল শুরু হয়েছে, সামনে তার জন্য অপেক্ষা করছে আরও সোনালী ভবিষ্যৎ।
কেন বৈভবের ব্যাটিং এতোটা অনন্য ও স্পেশাল?
বৈভব সূর্যবংশীর ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার আত্মবিশ্বাস এবং নির্ভীক মানসিকতা। ক্রিকেটের ব্যাকরণ মেনে খেলার পাশাপাশি আধুনিক ক্রিকেটের দাবি অনুযায়ী প্রথম বল থেকেই আক্রমণ করার ক্ষমতা তাকে অন্য সব তরুণ ব্যাটারের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে। রাজস্থান রয়্যালসের মেন্টর এবং কোচিং স্টাফরা প্রায়শই তার এই বিশেষ গুণের প্রশংসা করেছেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে যেখানে অনেক ক্রিকেটার আন্তর্জাতিক মানের বোলারদের গতি ও সুইং সামলাতে হিমশিম খান, সেখানে বৈভব অত্যন্ত সাবলীলভাবে পেস ও স্পিন দুই ধরনের বোলিংয়ের বিপক্ষেই সাবলীল শট খেলতে পারেন। তার ব্যাটিংয়ের ধরন অনেকখানি আধুনিক ক্রিকেটের কিংবদন্তিদের মনে করিয়ে দেয়।